
ওজন কমানোর পরামর্শ দিতে গিয়ে অনেকেই বেশি করে পানি পান করার কথা বলেন। খাবারের আগে এক গ্লাস পানি পান করা কিংবা কোমল পানীয়ের পরিবর্তে সাধারণ পানি বেছে নেওয়া, এমন অভ্যাস ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে বেশি পানি পান করলেই কি শরীরের চর্বি কমে? নাকি এটি ওজন কমানোর প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি নিজে শরীরের চর্বি পোড়ায় না। তবে কিছু অভ্যাসের সঙ্গে পানি পানকে যুক্ত করলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হতে পারে। বিশেষ করে চিনিযুক্ত ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে সাধারণ পানি পান করলে দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমতে পারে। আবার খাবারের আগে পানি পান করলে কারও কারও পেট ভরা অনুভূত হতে পারে, ফলে খাবারের পরিমাণ কম খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে এ বিষয়ে গবেষণার ফল সব ক্ষেত্রে একরকম নয়।
পানিতে ক্যালরি নেই
ওজন নিয়ন্ত্রণে পানি পানের একটি বড় সুবিধা হলো, সাধারণ পানিতে কোনো ক্যালরি নেই। অন্যদিকে কোমল পানীয়, চিনি মেশানো শরবত কিংবা মিষ্টি পানীয় থেকে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি প্রবেশ করতে পারে। এসব পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করলে খাবারের তালিকায় বড় কোনো পরিবর্তন না এনেও ক্যালরি গ্রহণ কমানো সম্ভব।
পানি পাকস্থলীতে কিছুটা জায়গা নেয়। ফলে খাবারের আগে পানি পান করলে কারও কারও পেট ভরা অনুভূতি হতে পারে এবং খাবারের সময় কম খাওয়া সম্ভব হতে পারে। তবে এই প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। শুধু খাবারের আগে পানি পান করলেই ওজন কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সুষম খাবার ও নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের বিকল্প হিসেবেও পানি পানকে দেখা উচিত নয়।
বেশি পানি পান করলে কি বিপাকক্রিয়া বাড়ে?
ঠান্ডা পানি পান করলে শরীরের তাপমাত্রার সঙ্গে পানির তাপমাত্রা সামঞ্জস্য করতে শরীরকে কিছুটা শক্তি ব্যয় করতে হয়। এ কারণে অনেকে মনে করেন, ঠান্ডা পানি পান করলে বেশি ক্যালরি খরচ হয় এবং দ্রুত ওজন কমে।
পানি পান করার পর শরীরের শক্তি ব্যয় ও বিপাকীয় কার্যক্রমে সাময়িক কিছু পরিবর্তন হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বেশি পানি পান করলেই শরীরের চর্বি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমবে। শুধু পানি পানের পরিমাণ বাড়িয়ে বিপাকক্রিয়া অনেক বাড়ানো বা উল্লেখযোগ্য ওজন কমানোর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পানি পানের পরিমাণ বাড়ানো কিংবা অন্য পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করার ফলে ওজন, বিএমআই বা কোমরের পরিধিতে কতটা পরিবর্তন আসে, তা নিয়ে গবেষণার ফলও একরকম নয়। তবে চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করলে ক্যালরি গ্রহণ কমার মাধ্যমে কিছুটা উপকার পাওয়া যেতে পারে।
তৃষ্ণাকে কি ক্ষুধা বলে ভুল হতে পারে?
কখনো কখনো তৃষ্ণা ও ক্ষুধার অনুভূতি আলাদা করে বোঝা কঠিন হতে পারে। ফিজিওলজি অ্যান্ড বিহেভিয়ার সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় তৃষ্ণা, ক্ষুধা ও খাওয়ার আচরণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে তৃষ্ণাকে ক্ষুধা ভেবে অতিরিক্ত খাওয়াই যে ওজন বাড়ার প্রধান কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। শরীরে পানির ঘাটতি হলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা কিংবা মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই খুব বেশি তৃষ্ণার্ত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দিনের বিভিন্ন সময়ে পানি পান করা ভালো।
তবে সত্যিই ক্ষুধা লাগলে শুধু পানি পান করে তা দমিয়ে রাখা ঠিক নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি ও পুষ্টি পেতে খাবার খাওয়া জরুরি। ক্ষুধা লাগলেই তা তৃষ্ণা বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
দিনে কতটুকু পানি পান করা প্রয়োজন?
সবার জন্য প্রতিদিন একই পরিমাণ পানি পান করার নিয়ম নেই। শরীরের আকার, শারীরিক পরিশ্রম, আবহাওয়া, গর্ভাবস্থা, শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো এবং শারীরিক অসুস্থতার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পানির চাহিদা নির্ভর করে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসের পরামর্শ অনুযায়ী, বেশির ভাগ মানুষের দিনে প্রায় ৬ থেকে ৮ কাপ বা গ্লাস তরল পান করার লক্ষ্য রাখা যেতে পারে। তবে কারও কারও এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন হতে পারে। এটি সবার জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত নির্দেশনা নয়।
সাধারণ পানি ছাড়াও কম চর্বিযুক্ত দুধ, চিনি ছাড়া চা ও কফি দৈনিক তরল গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে। খাবার থেকেও শরীর কিছুটা পানি পায়। গরম আবহাওয়া বা বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সময় তরলের চাহিদা বাড়তে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান হচ্ছে কি না, তা বোঝার জন্য তৃষ্ণার অনুভূতি ও প্রস্রাবের রং খেয়াল করা যায়। সাধারণত হালকা হলুদ রঙের প্রস্রাব পর্যাপ্ত পানির একটি ব্যবহারিক নির্দেশক হতে পারে। তবে প্রস্রাবের রং একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি নয়। খাবার, ওষুধ ও কিছু শারীরিক অবস্থার কারণেও প্রস্রাবের রং বদলাতে পারে।
অতিরিক্ত পানি পান করলে কি দ্রুত ওজন কমবে?
ওজন কমানোর আশায় অতিরিক্ত পানি পান করা উচিত নয়। অল্প সময়ের মধ্যে অনেক বেশি পানি পান করলে রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে। এ অবস্থাকে হাইপোন্যাট্রেমিয়া বলা হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক হতে পারে।
তাই ওজন কমানোর জন্য জোর করে কয়েক লিটার পানি পান করার প্রয়োজন নেই। শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি পান করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ওজন নিয়ন্ত্রণে পানি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে পানি পান করলে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ওজন কমানোর জন্য সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধারাবাহিক স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পানি পানের পরিমাণ বাড়ানো একা দ্রুত ওজন কমানোর কার্যকর উপায় নয়।



